ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ডিপিডিসি) প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকার জিটুজি প্রকল্পের দুর্নীতি অনুসন্ধানে রাষ্ট্রীয় অর্থ পাচারের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পের স্থানীয় ব্যয় যদি বিদেশি ইনভয়েসের সাথে অন্তর্ভুক্ত করে ইউএস ডলারে পরিশোধ করা হয়, তবে সরকারের রাজস্ব ক্ষতির পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয়ভাবে বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বাইরে চলে যাওয়ার আশংকা দেখা দেয়।
জিটুজি প্রকল্পের দুর্নীতি অনুসন্ধান এবং ডিপিডিসির নির্বাহী পরিচালক (প্রকৌশল) মোরশেদ আলম খানের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ, দুর্নীতিসহ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ তদন্তে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সহকারী পরিচালক (মানিলন্ডারিং-১) মুহাম্মদ জাফর সাদেক শিবলীর নেতৃত্বে দুই সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিটি চলতি বছরের ২২ এপ্রিল ঠিকাদারের সাথে চুক্তিপত্র ও ক্রয় সংক্রান্তসহ মোট ৭ ধরনের নথিপত্র চেয়ে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালককে চিঠি দেয়।
দুদক যে নথিগুলো তলব করেছে, তা হলো-
১. প্রকল্প বাস্তবায়নে যে সকল আইটেম/ইকুপমেন্ট এর চুক্তিতে একাধিক Country of Origin আছে, আমদানির সময় কিসের ভিত্তিতে একটি Country of Origin ঠিক করা হয়েছে সে সংক্রান্ত তথ্যাদির সত্যায়িত ছায়ালিপি।
২. বিদ্যুতের উপকেন্দ্র নির্মাণের ক্ষেত্রে বিল্ডিংসহ সিভিল কাজের সকল মালামাল বাংলাদেশ হতে সরবরাহ গ্রহণ করা সত্ত্বেও বৈদেশিক কারেন্সি কোন অনুমোদনের ভিত্তিতে বিল পরিশোধ করা হয়েছে সে সংক্রান্ত তথ্যাদির সত্যায়িত ছায়ালিপি।
৩. প্রকল্পের প্রাক্কলন প্রস্তুত এবং ঠিকাদারের সাথে চুক্তির সময় কিসের ভিত্তিতে 132/33/11KV, 120/120/50MVA Transformer. 132KV (Direct Burial and Common Cable Trench), 33KV Duct Bank Cable, 11/0.4KV OH Distribution Network ইত্যাদি আইটেম সমুহের সরবরাহ ও স্থাপনের ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে সে সংক্রান্ত তথ্যাদির সত্যায়িত ছায়ালিপি।
8. 132/33kV Substation নির্মাণের চুক্তিতে প্রাইস সিডিউলে বিভিন্ন উপকেন্দ্রে নির্মাণে দরের (Part 1) ভিন্নতার কারণ সংক্রান্ত তথ্যাদির সত্যায়িত ছায়ালিপি।
৫. প্রাইস সিডিউলের আইটেম বিবরণ "132/33/11KV. 120/120/50MVA Transformer with RTCC (Remote Tap Change Control). Local Control Cubic (LCC) (ONAN) (ONAF) ট্রান্সফরমার ক্রয়ের ক্ষেত্রে বাস্তবে প্রতিটি উপকেন্দ্রে কত রেটিং এর ট্রান্সফরমার ক্রয় সংক্রান্ত তথ্যাদির সত্যায়িত ছায়ালিপি।
৬. 1.E. Summary of substation building and civil work provisional estimate under G to G project আইটেমের ক্ষেত্রে provisional estimate এর উপরে ভিত্তি করে বিল প্রদান করা হয়েছে নাকি Price Variation হয়েছে? provisional estimate এবং Price Variation (যদি হয়) উভয় ক্ষেত্রে ডিটেইল আইটেম ভিত্তিক Price Bifurcation সংক্রান্ত তথ্যাদির সত্যায়িত ছায়ালিপি।
৭. প্রাক্কলন/প্রস্তাবনা থেকে শুরু করে অদ্যাবধি কর্মরত প্রকল্পের কাজে নিয়োজিত সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম ও পত্র যোগাযোগের ঠিকানা মোবাইল নম্বরসহ।
এসব তথ্য ৪ মে ২০২৬ এর মধ্যে দুদকে জমা দিতে বলা হয়েছিল। জিটুজি প্রকল্পের এক অসমর্থিত সূত্রের দাবি, দুদকের চাহিদা মোতাবেক সকল নথিপত্র সরবরাহ করা হয়েছে।
এর আগে, ২০২৫ সালে জিটুজি প্রকল্পের দুর্নীতি অনুসন্ধানে তিন সদস্যের তদন্ত দল গঠন করেছিল দুদক। ওই বছরের ৫ মে দুদকের উপপরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম স্বাক্ষরিত চিঠিতে ডিপিডিসিকে তিনটি প্রকল্পের সংশ্লিষ্ট সব দরপত্র, মূল্যায়ন প্রতিবেদন, বিল, চুক্তি ও চালানপত্র জমা দেওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল।
এদিকে, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “Expansion and Strengthening of Power System Network under DPDC Area (ESPSN)” প্রকল্পের আওতায় কিছু স্থানীয় সিভিল কাজ, নির্মাণসামগ্রী ও দেশীয় সেবার ব্যয় বিদেশি EPC Contractor-এর মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রায় (USD) পরিশোধ করা হয়েছে কিনা সে বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। সাধারণত আমদানিকৃত যন্ত্রপাতি ও বিদেশি উৎসের মালামালের বিপরীতে বৈদেশিক মুদ্রায় অর্থ পরিশোধ গ্রহণযোগ্য হলেও স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত মালামাল, সিভিল কাজ ও দেশীয় সেবার ক্ষেত্রে বাংলাদেশি টাকায় অর্থ পরিশোধ এবং প্রচলিত VAT, AIT ও Source TAX কর্তন হওয়া প্রত্যাশিত।
যদি স্থানীয় ব্যয় বিদেশি ইনভয়েসের সাথে অন্তর্ভুক্ত করে USD-এ পরিশোধ করা হয়ে থাকে, তবে সরকারের VAT ও TAX রাজস্ব ক্ষতির আশংকা তৈরি হতে পারে এবং অপ্রয়োজনীয়ভাবে বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বাইরে চলে যেতে পারে। এছাড়া এ ধরনের বৃহৎ G2G/EPC প্রকল্পে অনেক সময় প্রকৃত বাজারমূল্যের তুলনায় অধিক ব্যয় প্রাক্কলন (Overestimated Cost) নির্ধারণের অভিযোগও দেখা যায়, যা প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
খাতসংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা বলছেন, এ ধরনের বৃহৎ G2G (Government to Government) অথবা EPC ভিত্তিক প্রকল্পসমূহে অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত বাজারদরের তুলনায় ব্যয় প্রাক্কলন (Estimate) অধিক নির্ধারণের অভিযোগ উত্থাপিত হয়ে থাকে। বিশেষ করে বিদেশি ঠিকাদার কর্তৃক প্রস্তুতকৃত Cost Estimate ও Price Variation যাচাই যথাযথভাবে না হলে প্রকল্প ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
এছাড়াও, স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত মালামাল ও সিভিল কাজের ব্যয় বিদেশি মুদ্রায় (USD) পরিশোধ করা হলে নিম্নোক্ত আর্থিক প্রভাব সৃষ্টি হতে পারে:
* স্থানীয় ব্যয়ের বিপরীতে অপ্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বাইরে চলে যায়;
* বাংলাদেশি টাকায় পরিশোধ করলে যে VAT, AIT ও Source TAX কর্তন হতো, তা আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে এড়ানো সম্ভব হয়;
* বৈদেশিক মুদ্রার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়;
* দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও ডলার বাজারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে;
* বিদেশি EPC Contractor-দের জন্য সহজে currency Transfer-এর সুযোগ তৈরি হয়।
বাংলাদেশের মতো ডলার সংকটপূর্ণ অর্থনীতিতে স্থানীয় ব্যয়ের বিপরীতে বৈদেশিক মুদ্রায় অর্থ পরিশোধ অর্থনৈতিকভাবে যৌক্তিক কিনা, তা গভীরভাবে পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে, জিটুজি প্রকল্পে ব্যবহারের জন্য ১৪০ সেট ১৩২ কেভি ক্যাবল এক্সেসরিজ (ক্রস বন্ডিং জয়েন্ট) জার্মানি থেকে না এনে চীন থেকে আমদানি করার অভিযোগ উঠলে বিদ্যুৎ বিভাগ তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্তকারী কর্মকর্তা বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) মো. সবুর হোসেন অভিযুক্তদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ এবং নথিপত্র পর্যালোচনার পর ২০২৫ সালের ২৫ আগস্ট মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দেন। ওই প্রতিবেদনে ডিপিডিসির অনেক কর্মকর্তাকেই দায়ী করা হয়েছিল। বিদ্যুৎ বিভাগ দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দিলেও ডিপিডিসি কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
বাংলা স্কুপ/প্রতিবেদক/এইচএইচ/এসকে
জিটুজি প্রকল্পের দুর্নীতি অনুসন্ধানে ফের তৎপর দুদক
কেনাকাটায় অনিয়ম করে ১০০ কোটি টাকা ভাগ-বাটোয়ারা
দুদকের জালে ফেঁসে যাচ্ছে ডিপিডিসি